হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইসলামী শিক্ষায়ও সময়ের সদ্ব্যবহার এবং জীবনকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত প্রশ্ন ও উত্তর দেয়া হলো:
প্রশ্ন: আমি অতিরিক্ত ঘুমের সমস্যায় ভুগছি। যতই ঘুমাই না কেন, আরও ঘুমাতে ইচ্ছা করে। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা আমার জন্য খুবই কঠিন। এমনকি মাসের পর মাস চেষ্টা করেও নির্দিষ্ট সময়ে জাগার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারছি না। জানতে চাই, এমন কোনো কুরআনের আয়াত বা জিকির আছে কি, যা পাঠ করলে অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতা দূর করা যায়?
উত্তর: আপনার সমস্যার অন্যতম কারণ হতে পারে সময় ব্যবস্থাপনার অভাব এবং দৈনন্দিন জীবনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। মানুষের জীবনে যখন সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকে, তখন সে সময়ের মূল্য উপলব্ধি করে এবং সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের মানসিক প্রস্তুতি অলসতা ও অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।
এ প্রসঙ্গে আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) সময়ের গুরুত্ব ও পরিকল্পিত জীবনযাপনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন,
মুমিনের উচিত তার দিন-রাতকে তিন ভাগে বিভক্ত করা: এক ভাগ আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর সঙ্গে একান্ত সংযোগের জন্য, এক ভাগ জীবিকা অর্জন ও প্রয়োজনীয় কাজের জন্য এবং এক ভাগ বৈধ, সুন্দর ও আত্মপ্রশান্তিদায়ক বিশ্রামের জন্য। [১]
আজকের বিশ্বে সময়-সচেতনতাকে পরিকল্পনার প্রথম পাঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কার্যকর সময় ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হলো সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। একটু ভেবে দেখুন—
• কেন কিছু কাজ নির্দিষ্ট সময়ে ভালোভাবে সম্পন্ন হয়?
• কেন কিছু কার্যক্রম বিশেষ সময়ে অধিক ফলপ্রসূ হয়?
• কেন দিনের কিছু সময় কাজের প্রতি বেশি আগ্রহ ও উদ্যম সৃষ্টি করে?
পরিকল্পনাবিদদের মতে, এর কারণ হলো মানুষের জৈবিক ও শারীরিক সক্ষমতা সব সময় সমান থাকে না। দিনের কিছু সময় মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি কর্মক্ষম, মনোযোগী ও সৃজনশীল থাকে। যে ব্যক্তি নিজের এই কর্মক্ষম সময়গুলোকে চিহ্নিত করে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, সে প্রকৃত অর্থে সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
অনেক গবেষকের মতে, উপদেশ, অধ্যয়ন, লেখালেখি, চিন্তাভাবনা, মানসিক সৃজনশীলতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও কিছু সময় অন্য সময়ের তুলনায় বেশি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এ কারণেই সময় ব্যবস্থাপনাকে সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয়। [২]
সময় দ্রুত অতিক্রম করে যায়, আর সুযোগগুলো মেঘের মতো ভেসে চলে যায়। এ প্রসঙ্গে আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) বলেন:
الفرصة تمر مر السحاب، فانتهزوا فرص الخير
সুযোগ মেঘের মতো দ্রুত অতিক্রম করে যায়; অতএব, কল্যাণের সুযোগগুলোকে কাজে লাগাও। [৩]
মানুষ অনেক সময় অলসতা, ভয়, কর্মবিমুখতা, পরিকল্পনার অভাব এবং উন্নতির আকাঙ্ক্ষার ঘাটতির কারণে নিজের সামর্থ্যকে অপচয় করে। ফলে অমূল্য সময় হারিয়ে যায় এবং জীবনের বহু সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যায়। অথচ সঠিক পরিকল্পনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সীমিত সময়কেও অনেক বেশি ফলপ্রসূ করে তোলা সম্ভব।
অন্যদিকে, ইসলামী বর্ণনায় অতিভোজন থেকে বিরত থাকার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; কারণ অতিভোজন অনেক সময় শরীরে জড়তা সৃষ্টি করে এবং অতিরিক্ত ঘুমের প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা, দৃঢ় সংকল্প, পরিকল্পিত জীবনযাপন এবং নিজের দায়িত্ব ও লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলাও এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হতে পারে।
আল্লাহর সাহায্য কামনা করে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রতিও কুরআন গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
আর যারা আমাদের পথে সাধনা ও প্রচেষ্টা চালায়, আমরা অবশ্যই তাদেরকে আমাদের পথসমূহের দিকে পরিচালিত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গেই আছেন।
[সূরা আনকাবূত, ২৯:৬৯]
উল্লেখ্য, প্রশ্নে কুরআনের আয়াত বা বিশেষ জিকির সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলেও উল্লিখিত উত্তরে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বা জিকির উল্লেখ করা হয়নি। বরং সময়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে যদি পর্যাপ্ত ঘুমের পরও দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ঘুম, অবসাদ বা নির্দিষ্ট সময়ে জেগে উঠতে অস্বাভাবিক অসুবিধা অনুভূত হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। কারণ থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, বিষণ্নতা বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণেও এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তথ্যসূত্র:
[১] নাহজুল বালাগাহ, অনুবাদ: মুহাম্মদ দাশতি, পৃ. ৭২৪–৭২৫।
[২] আলী রেজায়িয়ান, সময় ব্যবস্থাপনা, সামত সাময়িকী, সংখ্যা ৭, পৃ. ৪৬।
[৩] নাহজুল বালাগাহ, অনুবাদ: মুহাম্মদ দাশতি, পৃ. ৬২৬–৬২৭।
আপনার কমেন্ট